বাংলাদেশে ড. মুহম্মদ ইউনুস যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন তখন দেশীয় এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন ছিল যে, তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচনের কথা উত্থাপিত হয়নি সুশীলা কারকি। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকার ব্যবস্থা থাকাকালীন রাষ্ট্রযন্ত্র এমনভাবে পরিচালিত হয়েছিল যে, রাষ্ট সংস্কারের প্রসঙ্গটিই তখন প্রধান গুরুত্ব পায়। যদিও ক্ষমতা গ্রহণের বেশ কিছুদিন পরেই বিএনপি এবং বেশ কিছু রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচনের তাগিদ শোনা গেছে। কিন্তু তখনও সাধারণ জনগনের মাঝে দ্রুত নির্বাচন কোনো আশা জাগাতে পারেনি। এদিকে নেপালের অন্তর্বর্তীকাঈন প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকি ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন দেয়ার কথা বলেছেন।
ড. মুহম্মদ ইউনুসের ক্ষমতা গ্রহণ এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার গঠন-পরিচালনার ১ বছরে, দেশের সংবিধান অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এবং সাংবিধানিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে দলীয় সরকারের প্রয়োজন এবং একটি নির্বাচনের প্রসঙ্গ সামনে আসতে থাকে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম, কর্মসুচি, উল্লেখ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনের প্রতিফলন দেশকে একটি জাতীয় নির্বাচনের প্রত্যাশার দিকে নিয়ে যায়।
একটি সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন যেমনি দেশের ভবিষ্যত নির্ণয় করে, তেমনি এর আগে রয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। যাকে বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কার বলা হয়েছিল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একটি সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন পুর্ববর্তী যে প্রস্তুতিগুলো অবশ্য প্রয়োজনীয়, তার মধ্যে কিছু হলো:
কিন্তু বাংলাদেশে এসবের কয়টি হয়েছে নিশ্চিত বলা যায়না।
এদিকে নেপালের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। নেপালে সুশীলা কারকি ক্ষমতা গ্রহনের শুরুতেই ছয় মাসের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলছেন এবং তারপর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়ার কথাও জানিয়েছেন। কিন্তু ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচনের জন্য নেপালে বিদ্যমান আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থা, সরকার ব্যবস্থা ঠিক কতটুকু প্রস্তুত, নিরাপদ, নিরপেক্ষ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি কতটা সেসম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। সাধারণত এধরনের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক সময়কালে দেশীয়, বৈদেশিক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সবকিছু সরকার পুনঃগঠনের অনুকূলে থাকেনা। কারণ পতিত সরকার ব্যবস্থায় বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা সংশোধন এবং স্বচ্ছতার সাথে পুনরায় চালু করা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সুশীলা কারকি বিবিসিকে যে লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়েছেন, তা নিশ্চিত কিছু নয়। অতএব নির্বাচনের বাস্তবতাও সম্ভাবনানির্ভর।
ক্ষমতা গ্রহনের পরমুহুর্তেই বিবিসিকে দেয়া সুশীলা কারকির সেই সাক্ষাৎকারটি সরাসরি নিচে লিপিবদ্ধ করা হলো:

ঐ সাক্ষাৎকারে তিনি ছয় মাসের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন, জেন জি-র আন্দোলন চলাকালীন হত্যা ও সহিংসতার তদন্ত এবং আগের সরকারের ব্যাপক দুর্নীতির তদন্তসহ নানা বিষয়ে বলেন। এবং তাকে কিছু প্রশ্ন করা হয়।
নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়েছে ২০২৬ এর ৫ ই মার্চ। সময়মতো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করার ক্ষেত্রে আপনাকে কী কী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে?
“আমি তো বলেইছি যে আমি দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করব। আপনি জানেন যে সাধারণ মানুষের দিক থেকে কতটা চাপের মুখে এই সরকার গঠিত হয়েছে। আমি আমার দায়িত্ব ছয় মাসের মধ্যে শেষ করে পদ থেকে সরে যেতে চাই। আগামী কয়েক দিনে নির্বাচন কমিশনকে সক্রিয় করে তুলব আমরা। প্রথমত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করতে হবে তাদের। একটা পুরনো ভোটার তালিকা আছে তাদের, কিন্তু সেটা হালনাগাদ করতে হবে। যদি দিনরাত কাজ করতে পারি তাহলে ছয় মাসে সেটা করা সম্ভব। যেদিন আমি ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেব, সেদিন থেকে আমি মুক্ত।”

বিগত সরকারের দুর্নীতির অভিযোগ এবং তদন্ত
দুর্নীতির অভিযোগগুলি নিয়ে তদন্ত করার জন্য কি আপনার কোনও কমিশন গঠনের পরিকল্পনা আছে?
“প্রথমে আমরা ১০-১১ জন সদস্যের একটা মন্ত্রীসভা গড়ব। কয়েকদিনের মধ্যেই এই কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে। কী আকারে দুর্নীতি হয়েছে, সেটা আগে জানা প্রয়োজন। আমরা যদি তদন্ত শুরু করতে পারি, পরবর্তী সরকারও সেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। আমাদের মনে হয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে যতক্ষণ না তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, ততদিন পর্যন্ত এই জাতি শান্তি পাবে না এবং আমরা নিশ্চিতভাবেই এটা (দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত) করব।”
সম্পত্তি ও জীবনহানির ঘটনাগুলি তদন্ত করে দেখার জন্য একটা উচ্চ পর্যায়ের কমিশন গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কী ধরনের কমিশন হবে এটি? তাদের কতদিন সময় দেওয়া হবে?
“বর্তমান মন্ত্রীসভায় আমরা মাত্র চারজন সদস্য আছি। আমাদের হাতে সময় রয়েছে ছয় মাস। এই ছয়টি মাসকে আমরা যতটা সম্ভব কাজে লাগাতে চাই। আমাদের পরিকল্পনা হল ওই তদন্ত এক মাসের মধ্যে শেষ করার, বা বড়জোর দেড় মাস। বিভিন্ন ক্ষেত্রের তিনজন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে এই তদন্ত চালানো হবে।”
মন্ত্রীসভার সম্প্রসারণ নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী? কতজন মন্ত্রী থাকবেন? কাদের মন্ত্রী করার কথা ভাবছেন আপনি? মন্ত্রীসভা সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিতে কি শুরু করেছেন?
“রাষ্ট্রপতি (রামচন্দ্র পৌড়েল) বলেছিলেন যে প্রতিটি রাজনৈতিক দল থেকে একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে মন্ত্রীসভা গঠন করতে। আমি বলি যে এটা অনুচিত হবে। আমি বলি যে মন্ত্রীসভা অরাজনৈতিক হওয়া উচিত এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তিদেরই রাখা উচিত। আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির সদস্যদের, দলিত, নারী ও অনগ্রসর শ্রেণীর সদস্যদের যাতে রাখা যায়, সেটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। অনেক নাম এসেছে। আমরা যাচাই করে দেখছি যে তারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কী না। রাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের বদলে অ-রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আনার চেষ্টা করব, অথবা প্রাক্তন সচিবদের, আদিবাসী গোষ্ঠী, দলিত, নারী ও অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে আসা যেতে পারে।”

মন্ত্রীসভায় শুধুই অ-রাজনৈতিক ব্যক্তিরা কেন? রাষ্ট্রপতি যে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে রাজনৈতিক দলগুলির সদস্যদের নেওয়া হোক, যাদের হয়তো অভিজ্ঞতাও আছে, সেই পরামর্শ মানতে আপনি অস্বীকার করলেন কেন?
“আমার মনে হয়েছিল যে যদি রাজনৈতিক সদস্যদের বেছে নিই, নির্বাচনের সময়ে তার অপব্যবহার হতে পারে। কারণ নির্বাচনের সময়েও মন্ত্রীসভার হাতে তো কিছু ক্ষমতা থাকবে, যেমন হেলিকপ্টার ব্যবহার ইত্যাদির মতো সুবিধা। আর আমি সেরকম ব্যক্তিই বেছে নিতে চেয়েছিলাম যারা নির্বাচনে লড়াই করবেন না। রাজনৈতিক সদস্যদের বেছে নিলে তো (মন্ত্রীসভার) সেই সব সদস্য নির্বাচনে লড়াই করবেন।”
মন্ত্রীদের কীভাবে বাছা হচ্ছে? রাজনৈতিক দলগুলির সুবিধা আছে যে তারা পরামর্শ নিতে পারে, যেটা আপনার নেই। চয়ন প্রক্রিয়া কীভাবে চলছে?
“আমাদের কিছু বন্ধু আছেন, যারা আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন। আমরা তাদের পরামর্শ নিচ্ছি আর মাঠ পর্যায়েও কাজ করছি। আবার ওই ব্যক্তির কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে যে (মন্ত্রীসভায় যোগ দেওয়ার ব্যাপারে) তার সদিচ্ছা আছে কী না। তিনজন সদস্যকে আমরা ইতোমধ্যে নিযুক্ত করেছি। বাকিদের আমরা (১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫) মঙ্গলবারের মধ্যে চূড়ান্ত করে ফেলবো। এটা একটা নির্বাচনী প্রক্রিয়া। ভারতে টি এন শেষন (ভারতের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার) যেভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতেন, সেভাবেই ভোট হওয়া উচিত। প্রতিটা বিষয় আইন আর নিয়ম অনুযায়ী হবে। কোনও ত্রুটি যাতে না থাকে। একটা সুষ্ঠু সরকার গঠিত হোক। আমরা সবাই মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি যাতে একটা সুষ্ঠু সংসদ গঠন করা যায় (ভোটের পরে)।”
যে জেন জি আন্দোলনকারীরা নতুন একটি সরকারের, প্রশাসনের দাবি তুলেছিল, তাদের একাংশের মধ্যে থেকেই সুশীলা কারকির বিরোধিতা করা হচ্ছে। একটা নতুন সরকারের দাবি যে গোষ্ঠীটি তুলেছিল, ইতোমধ্যেই তো তারা প্রতিবাদ করছে। আপনিও নিশ্চই শুনেছেন বিষয়টা। (এই পরিস্থিতির) কীভাবে মোকাবেলা করার পরিকল্পনা করছেন আপনি?
“হ্যাঁ, সেই গোষ্ঠীটিই তো সরকার গড়ার জন্য আমাদের নাম প্রস্তাব করেছিল। আমরা তো পদ চাই নি। এটা আমাদের সিদ্ধান্তও ছিল না। যখন আটই সেপ্টেম্বর ছাত্রদের হত্যা করা হল, আমরা এতটাই মন:ক্ষুণ্ণ হয়েছিলাম যে ব্যাপক দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অনিয়ম আর সুশাসনের অভাব নিয়ে ওরা যে দাবিগুলো তুলছিল, তা পূরণ করতে চেয়েছিলাম আমরা। কোনও কিছুতেই তো ১০০ শতাংশ সাফল্য বলে কিছু হয় নি। হয়ত আমরা সবগুলো দাবি পূরণ করতে পারব না, কিন্তু আমরা সর্বতোভাবে চেষ্টা করব। আমরা সব দায়িত্ব পালন করতে চেষ্টা করব কিন্তু যদি কিছু অপূর্ণ থেকে যায় তাহলে পরবর্তী সরকার আর সংসদ (নির্বাচনের পরে) সেগুলোর দায়িত্ব নেবে।”
একটি স্বাধীন দেশের জন্য সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণ নিয়ে আসে। তবে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন খুবই সময়সাপেক্ষ এবং সুকঠিন ব্যবস্থাপনার দাবি করে। একটি অন্তর্বতী সরকারকে তা করতে হলে পতিত সরকার ব্যবস্থা সংশোধন, রাজনৈতিক দলের প্রস্তুতি, জনগনের প্রস্তুতি, বিচার কার্য, বৈদেশিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা, অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা সহ নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়।
সেখানে ড. ইউনুস কতখানি সফল হয়েছেন এবং রাষ্ট্র সংস্কাররুপে দেশের রাজনৈতিক দল, সরকার, জনগন, নির্বাচন কমিশনকে গুছিয়ে এনে একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে নিয়ে যেতে পেরেছেন তা এখন দৃশ্যমান। ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন, পরিচালনা, স্বচ্ছতা, ক্ষমতায়ন নিয়েও ব্যাপক অভিযোগ এসেছে এবং সমালোচনা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কতদিনে রাষ্ট্রে টি. এন. শেষনের মত নির্বাচন দেয়ার পরিবেশ তৈরী করতে পারবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে কার্যক্ষমতা, পদক্ষেপ এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক অবস্থার ওপর। এখানে নিশ্চিতভাবে কিছু বলার সুযোগ নেই।
সুশীলা, ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মডেলে তার লক্ষ্যমাত্রায় কতখানি অগ্রসর হতে পারেন তা সময় বলে দেবে।
নেপালের অন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হলেন সুশীলা কার্কি
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।