অনুসরণ করুন
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
Google Play App Store
অন্যান্য উদ্যোগ
ট্রেন্ডিং

আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংঘাত কেন?

ফন্ট সাইজ:
Shares

বৃহস্পতিবার রাতে বিকট বিস্ফোরণের শব্দে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় কাবুলের ৬ নম্বর ডিস্ট্রিক্টের বাসিন্দাদের। ঘর থেকে বেরিয়ে তারা আকাশে যুদ্ধবিমানের গগনবিদারী আওয়াজ শুনতে পান। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান সহিংসতা এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ পাকতিয়া ও কান্দাহার প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। উল্লেখ্য, কান্দাহারকে তালেবান আন্দোলনের জন্মস্থান ও শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা চললেও, এই আগ্রাসন আসলে কে আগে শুরু করেছে তা নির্ভর করছে আপনি কার পক্ষ থেকে শুনছেন তার ওপর।

তালেবানের পাল্টা হামলা
আফগানিস্তানের তালেবান সরকার জানিয়েছে, ওই রাতে তারা সীমান্ত সংলগ্ন পাকিস্তানি সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে বড় ধরনের স্থল অভিযান চালিয়েছে। তাদের দাবি, তারা বেশ কয়েকটি সামরিক পোস্ট দখল করেছে এবং পাকিস্তানি সেনাদের আটক ও হত্যা করেছে।

তালেবান সরকারের মতে, এটি ছিল একটি ‘প্রতিশোধমূলক অভিযান’। তাদের অভিযোগ, এর আগে গত ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আফগান আকাশসীমা লঙ্ঘন করে নানগারহার ও পাক্তিকা প্রদেশে হামলা চালায়। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ওই হামলায় অন্তত ১৩ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে।

ইসলামাবাদের অবস্থান
অন্যদিকে ইসলামাবাদ বলছে ভিন্ন কথা। পাকিস্তানের দাবি, তাদের বিমান হামলা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নয়, বরং আফগানিস্তানে লুকিয়ে থাকা জঙ্গি গোষ্ঠী ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’ (টিটিপি) বা পাকিস্তানি তালেবানের আস্তানা লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। পাকিস্তান সরকার এই গোষ্ঠীকে ‘ফিতনা আল খাওয়াজির’ নামে অভিহিত করে।

পাকিস্তানের দাবি, সম্প্রতি ইসলামাবাদের একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৩০ জনের বেশি মানুষ নিহতের ঘটনায় টিটিপির হাত থাকার ‘চূড়ান্ত প্রমাণ’ তাদের কাছে রয়েছে। যদিও আইএস (IS) ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে, তবে পাকিস্তান বলছে এর নেপথ্যে টিটিপি-ই ছিল। তাদের আরও অভিযোগ, তালেবান সরকারের মদদে আফগানিস্তানে বসেই টিটিপি নেতারা এসব হামলার পরিকল্পনা করছে।

তালেবান সরকার অবশ্য বারবারই বলে আসছে যে, তাদের ভূখণ্ড অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে না এবং পাকিস্তানের এই হামলা সম্পূর্ণ ‘উস্কানিমূলক’।

পুরনো সংঘাত ও ব্যর্থ কূটনীতি
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকেই দুই দেশের মধ্যে এই অস্থিরতা শুরু হয়। সে সময় কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় দোহা এবং ইস্তাম্বুলে শান্তি আলোচনা হলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান আনতে পারেনি। ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শেষে উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছে।

সামরিক শক্তি বনাম গেরিলা যুদ্ধ
সামরিক শক্তির বিচারে পাকিস্তান অনেক গুণ এগিয়ে। আধুনিক ট্যাংক, যুদ্ধবিমান এবং উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পন্ন একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে তাদের। অন্যদিকে, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের কাছে রয়েছে সাবেক আফগান ও বিদেশি বাহিনীর ফেলে যাওয়া কিছু সামরিক সরঞ্জাম। পাকিস্তানের গভীরে বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতা তাদের নেই।

তবে দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকায় গেরিলা ও অপ্রচলিত যুদ্ধে তালেবানরা বেশ দক্ষ। চলমান এই সংঘাতে তালেবানরা প্রথমবারের মতো পাকিস্তানে হামলার জন্য সস্তা ও সহজে ব্যবহারযোগ্য ‘ড্রোন’ ব্যবহার করছে, যা যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।

মানবিক সংকট ও স্থবিরতা
সীমান্ত এলাকায় তথ্যের অবাধ প্রবাহ না থাকায় এই সংঘাত ঠিক কতটা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে দীর্ঘতম। এর ফলে আফগানিস্তানে জরুরি ওষুধ ও নিত্যপণ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।

দীর্ঘ চার দশকের যুদ্ধের পর ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর সাধারণ আফগানরা অন্তত বোমা হামলার ভয় থেকে মুক্ত ছিল। কিন্তু গত ছয় মাসের এই সহিংসতা তাদের সেই স্বস্তির জায়গাটিও কেড়ে নিয়েছে। চরম ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের মধ্যে এখন তাদের কাটছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top