হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু কর্তৃক প্রকাশিত ২০ দফা পরিকল্পনাটি হামাস বা গাজার তুলনায় ইসরায়েলের পক্ষেই অত্যন্ত অনুকূল।
হামাস জানিয়েছে, তারা এখনও পরিকল্পনাটি পর্যবেক্ষণ করছে এবং শীঘ্রই প্রতিক্রিয়া জানাবে। কিন্তু ট্রাম্প ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিকভাবে এর প্রতি সমর্থন চাইছেন, যার মধ্যে হামাসের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও রয়েছে, তাই হামাস ট্রাম্পের দেয়া প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করলে কঠিন অবস্থায় পড়তে পারে।
ওয়াশিংটন ত্যাগ করার আগে একটি সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিওতে নেতানিয়াহু বলেছেন “হামাস আমাদের বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে আমরাই হামাসকে বিচ্ছিন্ন করেছি”।

নেতানিয়াহুর ‘পূর্ণ বিজয়’-এর দৃষ্টিভঙ্গি
প্রায় দুই বছরের যুদ্ধের সময়, নেতানিয়াহু “পূর্ণ বিজয়” পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কেবল হামাসের হাতে বন্দী জিম্মিদের ফিরিয়ে দেওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রে এই গোষ্ঠীকে পরাজিত করাই নয়, বরং হামাসকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা।
ফিলিস্তিনি সমাজে হামাসের গভীর প্রভাব রয়েছে। তাই সমালোচকরা এই দৃষ্টিভঙ্গিকে অবাস্তব বলে উপহাস করেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের এই শান্তি চুক্তির পরিকল্পনা মূলত নেতানিয়াহুর ঐ লক্ষ্যকেই বৈধতা দেয়।
পরিকল্পনা কার্যকর হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে হামাসকে জীবিত এবং মৃত সকল জিম্মিকে মুক্তি দিতে হবে। ট্রাম্প এবং প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে হামাসকে নিরস্ত্র করতে এবং অরাজনৈতিক টেকনোক্র্যাটদের একটি দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হবে।
ইসরায়েল গাজার ভেতরে, ইসরায়েলের সীমান্ত বরাবর, একটি উন্মুক্ত সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখবে। আরব ও মুসলিম দেশগুলির সৈন্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গাজার ভেতরে নিরাপত্তার জন্য দায়ী থাকবে। গাজায় আন্তর্জাতিকভাবে অর্থায়নে পরিচালিত বিশাল পুনর্গঠন প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
এই পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য একটি চূড়ান্ত ভূমিকা কল্পনা করা হয়েছে – যদিও এতে বিরোধ ছিল নেতানিয়াহুর। তবে এর জন্য পশ্চিম তীরের কিছু অংশ পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষকে একটি ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচির মধ্য দিয়ে যেতে হবে যা বাস্তবায়নে বছরের পর বছর সময় লাগতে পারে।
যদিও ট্রাম্পের পরিকল্পনা ভবিষ্যতের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র সম্পর্কে খুবই অস্পষ্ট – তবু সেখানে নেতানিয়াহুর অসন্তোষ দেখা গেছে। যদিও এটিকে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের সম্ভাব্য “বিশ্বাসযোগ্য পথ” উল্লেখ করা হয়, তবে যেহেতু এটি অস্পষ্ট এবং কোনও সময়সীমা নেই, তাই নেতানিয়াহুর জন্য বিষয়টি বিলম্বিত বা উপেক্ষা করার সুযোগ রয়েছে।
নেতানিয়াহু তার সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ভিডিওতে স্পষ্ট বলেছেন, তিনি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতবাদে একমত হননি। “এটি ইসরায়েলের জন্য একটি বিপদ এবং অবশ্যই আমরা এতে একমত হবোনা”।
হামাস সম্মত হওয়ার সম্ভাবনা কতটা?
৭ অক্টোবর, ২০২৩ তারিখে যুদ্ধ শুরু করা হামাস এই পরিকল্পনার আওতায় কিছু দাবি করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসরায়েলকে শত শত ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দিতে হবে, যার মধ্যে প্রায় ২৫০ জন ইসরায়েলিদের উপর মারাত্মক হামলার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। এধরনের মুক্তি ইসরায়েলের কাছে স্বাভাবিকভাবেই অপ্রিয় হবে।
নেতানিয়াহুকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের মতবাদ স্বীকার করতে বাধ্য করতে পারে হামাস, যদিও সে আলোচিত সেই পরিকল্পনার শব্দগুচ্ছ অস্পষ্ট।
ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু গাজার ২০ লক্ষ ফিলিস্তিনিকে ভূখণ্ড থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ত্যাগ করেছে। নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সমস্ত ফিলিস্তিনি থাকতে পারবেন এবং যদি কেউ চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তাকে যেতে দেওয়া হবে।
তবে ইসরায়েল গাজাকে কোনোভাবেই সংযুক্ত করবেনা বা পুনর্বাসিত হতে দেবেনা বলেই জানিয়েছে। নেতানিয়াহুর এমন আকাঙ্ক্ষাকে প্রসংসা করেছেন ইসরায়েলপন্থী জাতীয়তাবাদী জোটের মিত্ররা।
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের কথা উল্লেখ করা হয়নি। পশ্চিমতীরের বন্ধ দরজার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরব কর্মকর্তারা বলেছেন, “ইসরায়েলের অনুরোধে এধরনের আলাপ উহ্য রাখা হয়েছে”।
যেসব ছোট ছোট লাভের কথা বড় করে বলা হচ্ছে, তা যদি হামাস মেনে না নেয় তবে ট্রাম্পের পরিকল্পনার অধীনে হামাস বড় কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হতে চলেছে বলে মনে হয়। তবুও, তারা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারে। মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫) হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য হামাসের জন্য “তিন থেকে চার দিন” সময় আছে।
দুই বছরের যুদ্ধের পর, হামাস ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং হামাস একসময় যতটা ক্ষমতাসীন ছিল, এখন তার খুব সামান্যই আছে। যদিও এই মুহুর্তে গাজায় হামাসের গুরুত্ব মূল্যায়ন করা কঠিন, তবে এটা স্পষ্ট যে গাজায় অবস্থিত অবরুদ্ধরা অনেকেই যেকোনো মূল্যে যুদ্ধের অবসান চায়।
তাছাড়া, ইসরায়েলি এবং আমেরিকান আক্রমণের পর অবদমিত রয়েছে এঅঞ্চলে হামাসের প্রধান মিত্র ইরান এবং লেবানন-ভিত্তিক হিজবুল্লাহ।
ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের প্রতি আরব দেশগুলো সমর্থন করছে। এতে হামাস কোণঠাসা হবে কিনা তা বলা কঠিন।
আরব ও মুসলিম দেশগুলির একটি যৌথ বিবৃতি ট্রাম্পের ঐ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে এবং জানিয়েছে এ প্রস্তাবকে চূড়ান্ত এবং বাস্তবায়নের জন্য তারা প্রস্তুত। আরব দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, মিশর এবং কাতার এবং অন্যান্য প্রভাবশালী দেশযেমন জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান এবং সৌদি আরব।
তবুও, আরব কর্মকর্তারা জানান, সোমবার হোয়াইট হাউস কর্তৃক প্রকাশিত প্রস্তাবের মূল বিষয়বস্তু কিছু আরব দেশের মধ্যে আপত্তির সঞ্চার করেছে।
তারা বলেছেন, ট্রাম্পের সাথে তাদের পূর্বে আলোচনা করা বিষয়বস্তু থেকে পাঠ্য পরিবর্তন করা হয়েছে যাতে এ প্রস্তাব ইসরায়েলের পক্ষে আরও অনুকূল হয়। তারা ইসরায়েলের সৈন্য প্রত্যাহার সম্পর্কে শর্তাবলী অস্পষ্ট রেখেছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে গাজা শাসন করার অনুমতি কবে দেয়া হবে এমন কিছু স্পষ্ট জানানো হয়নি এবং এতে ফিলিস্তিনের পক্ষে একটি পুর্নাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হবার স্পষ্ট পথ থাকেনা ।
যদিআরব কর্মকর্তারা আরোও বলেন, আরব দেশগুলো ঐ প্রস্তাবে আনিত পরবর্তী পরিবর্তন সম্পর্কে মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করছে। পর্দার আড়ালে আলোচনার জন্য তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
যদিও মনে করা হয়, আমেরিকা-ইসরায়েলের আক্রমণে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া হামাস সহজেই ট্রাম্পের এসব প্রস্তাব মেনে নেবে, কিন্তু ইসরায়েলের দীর্ঘকালীন গণহত্যা এবং তাতে আমেরিকার ভুমিকায় হামাসের পুর্বের প্রতিক্রিয়া এবং পদক্ষেপ তা বলছেনা।
ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনা পাইনি: হামাস
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।